গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তার ব্যস্ত রাস্তার পাশে, একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন মো. আসাদুজ্জামান তুহিন—একজন সাংবাদিক, যার কলম ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে অস্ত্র, যার কণ্ঠ ছিল অসহায় মানুষের পক্ষে আওয়াজ। ৭ আগস্ট ২০২৫, বৃহস্পতিবার, রাত পৌনে আটটার দিকে, সেই কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হলো। ধারালো অস্ত্রের নির্মম আঘাতে, গলা কেটে, প্রকাশ্য দিবালোকে তুহিনকে হত্যা করল একদল দুর্বৃত্ত। রক্তাক্ত দেহ পড়ে রইল মসজিদ মার্কেটের সামনে, যেখানে মিনিট আগেও তিনি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে স্বাভাবিক জীবনের স্বাদ নিচ্ছিলেন। এই হত্যা শুধু একজন সাংবাদিকের জীবন কেড়ে নেয়নি, এটি ছিল গণতন্ত্রের গলায় ছুরি, স্বাধীন সাংবাদিকতার মুখে থাপ্পড়, আর সত্যের পক্ষে কথা বলার অধিকারের ওপর নির্লজ্জ আক্রমণ। তুহিনের মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, ক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠেছে, আর ভয়ের কালো মেঘ ঘনিয়ে উঠেছে তাদের হৃদয়ে, যারা কলম হাতে সত্যের পথে হাঁটেন।
তুহিন ছিলেন দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থানার ভাটিপাড়া গ্রামের হাসান জামালের ছেলে তিনি গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। তার সাংবাদিকতা ছিল সাহসের প্রতীক। ঘটনার দিন বিকেলে তিনি ফেসবুকে লাইভ করেছিলেন, যেখানে চান্দনা চৌরাস্তার ফুটপাত ও দোকানপাট থেকে চাঁদাবাজির কালো হাতের কথা তুলে ধরেন। স্থানীয় চাঁদাবাজদের কুকীর্তি প্রকাশ করে তিনি যেন নিজের জীবনের ঝুঁকি বাড়িয়েছিলেন। তার সেই লাইভ ভাইরাল হয়, মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। রাতে তিনি আরেকটি ভিডিও পোস্ট করেন, ক্যাপশনে লেখেন, “যেমন খুশি তেমন রাস্তা পার হওয়ার দৃশ্য, গাজীপুর চৌরাস্তা।” এই পোস্টও সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলে। কিন্তু এই সাহসের মূল্য তাকে দিতে হলো জীবন দিয়ে। রাতে চায়ের দোকানে বসে থাকার সময় ৪-৫ জন দুর্বৃত্ত তাকে ঘিরে ধরে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে, গলা কেটে তাকে হত্যা করে তারা পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই তুহিনের প্রাণবায়ু উড়ে যায়। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে, কিন্তু হত্যার কারণ এখনও “অজ্ঞাত” বলে দাবি করছেন থানার ওসি শাহীন খান। এই “অজ্ঞাত” শব্দটি যেন সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় বিচারহীনতার এক অলিখিত শপথ।
একই দিনে, গাজীপুরের সাহাপাড়া এলাকায় আরেক সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন সৌরভের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। দৈনিক বাংলাদেশের আলো পত্রিকার এই স্টাফ রিপোর্টার অটোরিকশা ও সিএনজি চালকদের কাছ থেকে দৈনিক ৩০-৪০ টাকা চাঁদা আদায়ের তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। তার এই তৎপরতা চাঁদাবাজদের চোখে বিষ হয়ে দাঁড়ায়। ৭-৮ জনের একটি দল তাকে ঘিরে ইট দিয়ে মাথায়, মুখে আঘাত করে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, রক্তাক্ত মুখে আনোয়ার মাটিতে পড়ে আছেন, আর হামলাকারীরা তাকে নির্মমভাবে মারছে। পাশেই পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকলেও প্রথমে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরে স্থানীয়রা ও পুলিশ তাকে উদ্ধার করে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। আনোয়ারের মা আনোয়ারা সুলতানা অভিযোগ করেন, তার ছেলে কোনো অপরাধ না করেও এই নৃশংসতার শিকার হয়েছে। তার অভিযোগে বলা হয়, চাঁদাবাজ রক্তিম, সৌরভ, ফরিদসহ ১৫-১৬ জন ব্যক্তি তার ছেলেকে অপহরণ করে একটি চায়ের দোকানের পেছনে নিয়ে যায়, ইট ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে, এবং তার কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন ও ২৬,২৫০ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এই ঘটনা সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—কেন এই হামলাকারীরা এত নির্ভয়?
বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ) তুহিনের হত্যার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত বিচারের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি এই হত্যাকে সাংবাদিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের একটি প্রকাশ হিসেবে দেখছে। স্থানীয়দের অনেকে অভিযোগ করেছেন, তুহিনের হত্যার পেছনে চাঁদাবাজ গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থাকা কোনো শক্তি কাজ করছে। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি এখনও অন্ধকারে। এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশে সাংবাদিকদের জন্য ক্রমবর্ধমান বিপদের একটি ছবি এঁকে দিচ্ছে। গত কয়েক বছরে সাংবাদিকদের হত্যা, মারধর, হয়রানি, গ্রেপ্তার ও মামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি, দুর্নীতির প্রকাশ, আর স্থানীয় ক্ষমতাধর গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ।
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম মিরনকে হত্যার উদ্দেশ্যে কুপিয়ে জখম করা হয়। তিনি কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পৌর যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এই হামলার প্রতিবাদে স্থানীয় সাংবাদিকরা বিক্ষোভ করেন, দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান। একই দিনে সাতক্ষীরায় কাচ্চি ডাইন রেস্তোরাঁয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের অভিযান কভার করতে গিয়ে চারজন ফটো সাংবাদিকের ওপর হামলা হয়। ১৭ নভেম্বর ২০২৪, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে দৈনিক কালবেলার সাংবাদিক জাহাঙ্গীর মাহমুদের ওপর হামলা চালানো হয়। মাদক, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের সংবাদ প্রকাশের জেরে ছাত্রদলের সাবেক নেতা ইয়াসিন মিয়ার নেতৃত্বে ৪০-৫০ জন তাকে ইট দিয়ে আঘাত করে, ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। ১৬ মার্চ ২০২৫, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রতিবাদে মানববন্ধন হয়। ৩১ জুলাই ২০২৫, কুমিল্লার মুরাদনগরে বিক্ষোভ সমাবেশ কভার করতে গিয়ে সাংবাদিক মো. শাহে ইমরানের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়।
এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, ১৯৯২ সাল থেকে বাংলাদেশে ৩২ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নিহত হয়েছেন। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ২০১৩ সালে সাংবাদিক নির্যাতনের হার ছিল ১২.৫%, যা ২০১৪ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩.৬৯%-এ। এর মধ্যে প্রায় ২৩% নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের হাতে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের ২০২২ সালের তথ্য বলছে, ১১৯ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে হামলা, মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৮ জন পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হামলার শিকার হন, ১৯ জন প্রকাশিত সংবাদের জেরে মামলার মুখোমুখি হন। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় ছয়জন সাংবাদিক নিহত হন, যারা গুলিবিদ্ধ বা গণপিটুনির শিকার হন। এই ঘটনাগুলোর কোনোটিরই বিচার এখনও সম্পন্ন হয়নি।
ইউনেস্কোর ২০২২-২৩ সালের প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক হত্যার সংখ্যা ৩৮% বেড়েছে। বাংলাদেশে এই প্রবণতা আরও ভয়াবহ। সাংবাদিকরা স্থানীয় ক্ষমতাধর গোষ্ঠী, রাজনৈতিক নেতা, এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হচ্ছেন। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি প্রকাশের কারণে তুহিন ও আনোয়ারের মতো সাংবাদিকরা প্রাণের ঝুঁকি নিচ্ছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই দায়মুক্তির সংস্কৃতির সমালোচনা করেছে। ভয়েস নামক একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পরও সাংবাদিকরা অনলাইন ও অফলাইনে হুমকি, সহিংসতা ও বিদ্বেষের মুখোমুখি হচ্ছেন।
বাংলাদেশে সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত আইনি কাঠামো নেই। ৫ আগস্ট ২০২৫, জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের একটি সমাবেশে সাংবাদিক নেতারা গণমাধ্যম সংস্কার ও সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের দাবি জানান। তারা বলেন, ১৭ বছর ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী সাংবাদিকরা সাহসী সাংবাদিকতা করছেন, কিন্তু তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। ২০২৪ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রসহ ১২টি দেশ বাংলাদেশে সাংবাদিক হয়রানি ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।
তুহিনের হত্যা ও আনোয়ারের ওপর হামলা বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জন্য ক্রমবর্ধমান বিপদের প্রতীক। যখন একজন সাংবাদিক দুর্নীতি, চাঁদাবাজি বা সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তখন তিনি শুধু কলম নিয়ে লড়েন না, জীবন দিয়ে লড়েন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দরকার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আর সাংবাদিকদের সুরক্ষার জন্য শক্তিশালী আইন। সরকার, গণমাধ্যম সংস্থা, আর নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই অন্ধকার থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। তুহিনের রক্তে লেখা সত্যের কণ্ঠ যেন চিরতরে স্তব্ধ না হয়, সেই দায়িত্ব আমাদের সবার।